হাবিবুর রহমান-হাবিব সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা-সুনামগঞ্জ
এই পৃথিবীর বুকে মানুষের আগমন শূন্য হাতে, আর বিদায়টাও চিরন্তন শূন্যতায়। জন্ম থেকে মৃত্যু—এই দুই দিগন্তের মাঝখানের সময়টুকুর নামই জীবন। অথচ এই সংক্ষিপ্ত সময়ে মানুষের চাওয়া-পাওয়া, লোভ-লালসা আর অহংকারের যেন কোনো শেষ নেই। আমরা প্রতিনিয়ত ছুটে চলছি এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায়। ‘আরও চাই, আরও চাই’—এই অন্ধ মোহ আমাদের তাড়া করে বেড়ায় দিন-রাত। কিন্তু দিনশেষে আমরা কি ভেবে দেখেছি, এই যে তীব্র প্রতিযোগিতা, এই যে পাহাড়সম সম্পদ গড়ার নিরন্তর চেষ্টা, এর শেষ পরিণতি কী?
আমার এই ছোট্ট জীবনের ক্যানভাসের দিকে তাকালে বুকটা হু-হু করে ওঠে। শৈশবেই হারিয়েছি দাদা-দাদিকে। এরপর একে একে চাচা, ফুফু, ছোট দাদি, জন্মদাতা পিতা, এমনকি নিজের আপন ছোট ভাই পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। প্রতিবেশী, ভাই-বোন, কত আত্মীয়-স্বজনকে যে এই দুচোখে বিদায় জানিয়েছি, কত প্রিয় মানুষকে নিজের হাতে কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে শুইয়ে দিয়ে এসেছি। যারা একদিন আমার চারপাশ আলো করে রাখতেন, আজ তারা সবাই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে নীরব, নিথর।
প্রিয়জনদের এই চলে যাওয়া আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আজ যারা আছেন, কাল তারা নেই। একদিন এই মহাকালের ডাক আমার কাছেও আসবে। আমাকেও গ্রহণ করতে হবে মৃত্যুর অবধারিত স্বাদ। আমিও হব এক খণ্ড লাশ। সেদিন যে ঘরটাতে আমি বুক ফুলিয়ে চলতাম, সেই ঘর থেকেই আমার নিথর দেহটা বের করে আনা হবে। আমাকে পরানো হবে সাদা কাপড়ের এক পোশাক, যার নাম কাফন।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, মানুষের তৈরি পোশাকে হাজারটা পকেট থাকে—টাকা, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির স্মারক বয়ে বেড়ানোর জন্য। কিন্তু সেই শেষ যাত্রার পোশাক অর্থাৎ কাফনে কোনো পকেট থাকে না। কবরের সেই অন্ধকার ঘরে কোনো আলমারি বা লকার রাখার জায়গাও নেই। এই দুনিয়ায় ঘাম ঝরিয়ে অর্জিত সকল সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স—সব এখানেই পড়ে থাকবে। বিদায়ের দিনে বুক ফেটে কেঁদে আকুল হওয়া আদরের স্ত্রী, কলিজার টুকরো ছেলে-মেয়ে, কেউ সেদিন সঙ্গী হবে না। সবাই কবরের পাড়ে মাটি দিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ঘরে ফিরে আসবে।
বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি আল্লামা ইকবাল একটি চিরন্তন সত্যকে খুব সহজ ভাষায় মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জীবন দেওয়া হয়েছিল রবের ইবাদত ও সন্তুষ্টির জন্য, অথচ আমাদের সমস্ত মূল্যবান সময় কেটে যাচ্ছে কিছু ‘কাগজের টুকরো’ অর্থাৎ টাকা উপার্জনের পেছনে। যে কাগজের টুকরোর জন্য মানুষ আজ বিবেক বিক্রি করছে, অন্যায় আর দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে, সেই কাগজের উপযোগিতা কিন্তু এই মাটির পৃথিবী পর্যন্তই। দুনিয়ার আদালতে বিত্তবান বা ক্ষমতাশালীরা হয়তো অর্থ আর প্রভাবের জোরে পার পেয়ে যান, কিন্তু মৃত্যুর ফেরেশতা বা মালাকুল মউতের দরবারে কোনো ঘুষ চলে না, কোনো সুপারিশ খাটে না। সেখানে রাজা আর ফকির, ধনী আর দরিদ্র—সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়।
হারে দুনিয়া!!! তাও কেন যেন আমাদের ভেতরের মোহভঙ্গ হয় না। আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের মৃত্যুর খবর শুনি, জানাজায় শরিক হই, কবরস্থানে প্রিয়জনদের মাটি দিয়ে আসি। তাও কেন যেন আমরা ভাবি, মৃত্যু হয়তো আমাদের স্পর্শ করবে না। এই উদাসীনতাই মানুষকে অন্ধ করে রাখে।
’কাফনে কোনো পকেট নেই’—এই অমোঘ সত্যটি যদি মানুষ প্রতি মুহূর্তে মনে রাখত, তবে পৃথিবীতে এত হাহাকার, এত অন্যায় আর শোষণ থাকত না। সম্পদ থাকা বা উপার্জন করা দোষের নয়, কিন্তু সেই সম্পদের মোহে পড়ে নিজের আত্মাকে কলুষিত করা চরম মূর্খতা। আসুন, ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে কাগজের টুকরোর পেছনে অন্ধ হয়ে না ছুটে, এমন কিছু অর্জন করি যা কবরের ওপারেও আমাদের সঙ্গী হবে। দিনশেষে আমাদের সাথে শুধু যাবে আমাদের সৎ কর্ম, মানুষের ভালোবাসা আর মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আমাদের গভীর আনুগত্য।
এক জীবন্ত অনুভূতির কোলাজ: বাবার স্মৃতি ও শেষ বিদায়
কলামিস্ট হাবিবুর রহমান-হাবিবের এই লেখার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল ২০২১ সালের ৫ মার্চ। সেদিন তিনি চিরবিদায় জানিয়েছিলেন তাঁর জন্মদাতা পিতা পরম শ্রদ্ধেয় আব্দুল মান্নাফ (মুন্সী) মহোদয়কে।
সেদিন মরহুমের প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উনার কর্মস্থল শাল্লার ‘শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’ খেলার মাঠে। সেখানে উপচে পড়া মানুষের ভিড় আর নিস্তব্ধতা যেন এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। এরপর শাল্লা উপজেলার শাল্লা ইউনিয়নের অন্তর্গত কান্দিগাঁও গ্রামে উনার দ্বিতীয় জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে কান্দিগাঁও পাঞ্জেগানা কবরস্থানে উনাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ, ঘর-বাড়ি, চেনা পরিবেশ—সবকিছুই আজ আগের মতো রয়ে গেছে। কালের নিয়মে কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি; কেবল নেই সেই মানুষটি, যিনি পরম মমতায় এই সবকিছু আগলে রাখতেন। বাবার সেই শেষ বিদায়ের দৃশ্য এবং এই শূন্যতা লেখকের হৃদয়ে “কাফনে কোনো পকেট নেই” এর মতো এক শাশ্বত দর্শনকে চিরদিনের জন্য গেঁথে দিয়েছে।