হাবিবুর রহমান হাবিব
পবিত্র জুমার দিনের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ আমল হলো সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা। প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়কে নূর দ্বারা আলোকিত করা হবে” (সহীহ মুসলিম)। তবে এই সূরার মাহাত্ম্য কেবল সওয়াব অর্জনের তিলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে লুকিয়ে আছে মানবজীবনের চার মহাসংকটের বাস্তব সমাধান ও চার শক্তিশালী দোয়া। আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও কর্মজীবনের নানা টানাপোড়েনে সূরা কাহফের এই আমলগুলো হতে পারে অন্ধকার পথের আলোকবর্তিকা।
যখন কোনো মানুষ ক্যারিয়ার, ব্যবসা বা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সঠিক ও ভুলের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন, তখন আসহাবে কাহফের (গুহাবাসী যুবকদল) প্রার্থনাটি পথ দেখাতে পারে। তারা যখন ঈমান বাঁচাতে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, তখন নিজেদের মেধার ওপর ভরসা না করে আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের তাওফিক চেয়ে দোয়া করেছিলেন, “রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতান ওয়া হাইয়্যিলানা মিন আমরিনা রাশাদা।” অর্থাৎ: “হে আমাদের রব! আমাদের আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।” (আয়াত: ১০)। এই আয়াতটি জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী।
আবার সম্পদ, সুন্দর সন্তান, ক্যারিয়ারের সাফল্য বা যেকোনো অর্জন মানুষের মনে অজান্তেই অহংকার এনে দিতে পারে। সূরা কাহফে বর্ণিত দুই বাগানওয়ালার কাহিনীতে মুমিন সঙ্গীটি অহংকারী ধনীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, সব সাফল্যই আসলে আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি তাকে বলতে বলেছিলেন, “মাশাআল্লাহু লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” অর্থাৎ: “আল্লাহ যা চেয়েছেন (তাই হয়েছে), আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই।” (আয়াত: ৩৯)। এই অবিনশ্বর বাক্যটি একদিকে মানুষকে আত্মগরিমা থেকে মুক্ত রাখে, অন্যদিকে নিজের অর্জিত নেয়ামতকে অন্যের ক্ষতিকর বদনজর থেকে রক্ষা করে।
অনুরূপভাবে, নতুন কোনো দায়িত্ব, উচ্চশিক্ষা কিংবা কোনো বড় চ্যালেঞ্জিং কাজের শুরুতে নিজের শক্তির চেয়ে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সমর্পণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। মুসা (আ.) যখন খিজির (আ.)-এর সাথে এক কঠিন জ্ঞানার্জনের সফরে বের হয়েছিলেন, তখন তিনি নিজের ধৈর্যের ওপর অহংকার না করে দৃঢ় সংকল্পের সাথে বলেছিলেন, “সাতাজিদুনি ইনশাআল্লাহু সাবিরান ওয়ালা আসি লাকা আমরা।” অর্থাৎ: “আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করবো না।” (আয়াত: ৬৯)। কোনো কঠিন কাজ শুরু করার সময় নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসের চেয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করা যে অধিক উত্তম, এই আয়াত আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করার পর মানুষের করণীয় কী, তাও সূরাটিতে বর্ণিত হয়েছে। পরাক্রমশালী বাদশাহ জুলকারনাইন যখন বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করে এক মজলুম জাতিকে যাযাবরদের ফিতনা থেকে বাঁচালেন, তখন তিনি এর কৃতিত্ব নিজের বীরত্ব বা প্রযুক্তির ওপর দেননি। তিনি পরম বিনয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “কালা হাযা রাহমাতুম মির রাব্বি।” অর্থাৎ: “তিনি বললেন—এটা আমার রবের রহমত।” (আয়াত: ৯৮)। সফলতার চূড়ান্ত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এমন মানসিকতা লালন করলে স্রষ্টার অনুগ্রহ আরও বহু গুণ বৃদ্ধি পায়।
সূরা কাহফ কেবল কোনো ঐতিহাসিক কাহিনীর সংকলন নয়, এটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক জীবন্ত নির্দেশিকা। আসুন, প্রতি জুমার দিন শুধু প্রথাবদ্ধ তিলাওয়াত নয়, এই দোয়াগুলোর পঠন ও মর্মার্থ অনুধাবন করে তা আমাদের চিন্তাভাবনা ও যাপিত জীবনের অংশ করে তুলি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা, সুনামগঞ্জ।