সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় শিপু

Dainik Shallar Khabor.com
প্রকাশিত September 27, 2026
সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় শিপু

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যে কোনো মুহূর্তে ঘোষণা হতে পারে সিলেট জেলা ছাত্রদলের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্রই এখন বইছে নতুন নেতৃত্ব ঘিরে আলোচনার জোয়ার। বিশেষ করে জেলা ছাত্রদলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সাধারণ সম্পাদক’ পদটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। পদপ্রত্যাশী একাধিক প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ থাকলেও তৃণমূলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক আপসহীন, রক্তস্নাত ও পরীক্ষিত ছাত্রনেতার নাম—হিলাল উদ্দিন শিপু।

বর্তমানে জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা হিলাল উদ্দিন শিপুর রাজনৈতিক পথচলা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সুবিধা নেওয়া কোনো গল্প নয়; বরং বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে রক্ত, ঘাম, মামলা আর নির্মম নির্যাতনের এক জীবন্ত দলিল।

হিলাল উদ্দিন শিপুর রাজনৈতিক লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল স্কুলজীবনেই। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান বলয়ের রাজনীতির মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রথম পা রাখা। শুরু থেকেই ‘জামান গ্রুপ’-এর একনিষ্ঠ ও নির্ভীক লড়াকু কর্মী হিসেবে রাজপথে সক্রিয় হন তিনি। সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছাত্রদলের পতাকাতলে কাজ করতে গিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ গ্রুপের সন্ত্রাসীদের বর্বর হামলার শিকার হন শিপু ও তাঁর ভাই নিজাম উদ্দিন টিপু। হামলায় শিপুর এক হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। শরীরে নির্মম ক্ষতের যন্ত্রণা ও প্লাস্টার করা ভাঙা হাত নিয়েই তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন—যা তৎকালীন সময়ে সিলেটের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

২০১২ সালে বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর সিলেটের রাজপথ যখন উত্তাল, তখন থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে দেখা যায় হিলাল উদ্দিন শিপুকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের নেতৃত্বে সিলেটের প্রতিটি হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলে তিনি বুলেটের ভয় উপেক্ষা করে অংশ নেন। রাজপথ কাঁপানো ‘ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি আন্দোলন বেগবান রাখতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে এবং স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে বিএনপি ঘোষিত ধারাবাহিক রাজপথের আন্দোলনেও তিনি সাহসিকতার সাথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

স্কুল পেরিয়ে সিলেটের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র মদন মোহন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েও স্বস্তি মেলেনি। সেখানে বৈরী ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে দফায় দফায় ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে হয় তাঁকে। শত রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও হামলার মুখেও তিনি সেখান থেকে বাংলা বিষয়ে সফলভাবে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে তিনি সিলেট ল’ কলেজে ভর্তি হন। তৎকালীন সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের কমিটি থাকলেও প্রকাশ্য কর্মসূচিতে তাদের নিষ্ক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শিপু ছিলেন ব্যতিক্রম। জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক থাকা অবস্থায় ল’ কলেজে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অসহায় ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণের মানবিক উদ্যোগ নেন তিনি। এই আয়োজন চলাকালীন অতর্কিত হামলা চালায় ল’ কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি আবু নাহিদ সোহান, সাধারণ সম্পাদক কামরুল হোসেন আল-আমিন ও সহ-সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান সাগরের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী বাহিনী। তারা শিপু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করতে হামলা চালায়। তবে সেখানে দমে যাননি তিনি। সন্ধ্যার মধ্যেই সাধারণ শিক্ষার্থী ও কর্মীদের সংগঠিত করে এক তীব্র পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শিপুর নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের সেই সাহসিকতার মুখে সেদিন ক্যাম্পাস ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় ছাত্রলীগ। পরদিনই ‘ল’ কলেজ ছাত্রকল্যাণ পরিষদ’-এর ব্যানারে সাহসের সাথে সফলভাবে সেই বই বিতরণ কর্মসূচি সম্পন্ন করে রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ দেন তিনি।

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখনই বিরোধী মত ও আন্দোলন দমাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা কারফিউ জারি করা হয়েছে, তখনই সিলেট বিএনপির আপোসহীন নেতা অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের নেতৃত্বে রাজপথে নেমে এসে একাধিকবার নির্ভীকভাবে কারফিউ ভঙ্গ করেন হিলাল উদ্দিন শিপু ও তাঁর সহযোদ্ধারা। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে যখন স্বৈরশাসকের বুলেট ও বুটের তলায় পুরো দেশ অবরুদ্ধ, সিলেটে জারি করা হয়েছিল সান্ধ্য আইন (কারফিউ)—তখনও জীবনের মায়া ত্যাগ করে অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের নির্দেশে সিলেটে প্রথম কারফিউ ভঙ্গ করে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা। ২০২৩ সালের সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিটি ক্ষণে তিনি ছিলেন ফ্রন্টলাইনে। ফ্যাসিবাদবিরোধী এই লড়াইয়ে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও হামলার মুখে একাধিকবার গুরুতর আহত হয়েও এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটেননি এই ছাত্রনেতা।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিজয়ের পরও নিজেকে বিশ্রাম দেননি শিপু। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’ রূপরেখা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে তিনি দিন-রাত মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তৃণমূল কর্মীদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তিনি সবসময় সক্রিয় রয়েছেন। এছাড়া সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে সিলেট-৪ আসনের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় কমিটি গঠন করেন এবং সেখানকার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

নিজের রাজনৈতিক অতীত ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশা নিয়ে হিলাল উদ্দিন শিপু বলেন, আমি কখনোই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পদের লোভে ছাত্রদলের রাজনীতি করিনি। স্কুলজীবন থেকেই অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান ভাইয়ের রাজনৈতিক নির্দেশনায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কালজয়ী আদর্শ এবং সাবেক ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদায়া জিয়া ও দেশনায়ক তারেক রহমানের দিকনির্দেশনাকে বুকে ধারণ করে মাঠে আছি। ফ্যাসিবাদের আমলে ছাত্রলীগের নৃশংস হামলা, হাত ভেঙে দেওয়া, কারাগারের অন্ধকার, একের পর এক মামলা কিংবা স্বৈরাচারের বুলেটের মুখে একাধিকবার কারফিউ ভাঙা—কোনো কিছুই আমাকে জাতীয়তাবাদের পথ থেকে সরাতে পারেনি। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও আমরা কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমেছিলাম।

তিনি আরও বলেন, আজ সিলেটের রাজপথের লড়াইয়ের সহযোদ্ধা ও তৃণমূলের সাধারণ কর্মীরা যে ভালোবাসা দেখিয়ে আমাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চাইছেন, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে হতে পারে না। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব যদি আমার অতীত ত্যাগ বিবেচনা করে এই দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পণ করেন, তবে আমি সিলেট জেলা ছাত্রদলকে মেধা, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের সমন্বয়ে একটি আদর্শ ও অপরাজেয় ছাত্রসংগঠনে রূপান্তর করব। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায় এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে সিলেটকে গড়ে তোলাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।

সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে হিলাল উদ্দিন শিপুর মতো একজন ক্লিন ইমেজ, উচ্চশিক্ষিত এবং আপসহীন লড়াকু নেতৃত্বকেই দেখতে চাইছেন মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। কর্মীদের মতে, যিনি স্কুলজীবন থেকে জামান বলয়ের বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে রাজপথে রক্ত ও ঘাম ঝরিয়েছেন, ইলিয়াস আলীর সন্ধানে আন্দোলন করেছেন, ভাঙা হাত নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন আর স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একাধিকবার কারফিউ ভেঙেছেন—তিনিই সাধারণ সম্পাদক হওয়ার প্রকৃত হকদার। বসন্তের কোকিল কিংবা সুযোগসন্ধানী নেতৃত্ব নয়, শিপুর মতো রাজপথের লড়াকু নেতৃত্ব আসলেই সিলেট ছাত্রদল প্রকৃত অর্থে একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হবে।

দলের হাইকমান্ড থেকেও নীতিগতভাবে স্পষ্ট আভাস দেওয়া হয়েছে—চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন বাজি রাখা এবং বিগত দিনের মামলা-হামলায় জর্জরিত ত্যাগী নেতৃত্বই স্থান পাবে নতুন কমিটিতে। সেই রাজনৈতিক সমীকরণে তৃণমূলের আস্থা ও ভালোবাসায় সিক্ত হিলাল উদ্দিন শিপুই এখন সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে সবচেয়ে জোরালো ও আলোচিত নাম।