• ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

মধু মাসের কুটুম পাখি

Dainik Shallar Khabor.com
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬
মধু মাসের কুটুম পাখি

 হাবিবুর রহমান হাবিব,  সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা-সুনামগঞ্জ :::

​জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে গাছের ছায়ায় বসলে শরীর জুড়ে যে ক্লান্তি নামে, তা নিমেষেই দূর করে দেয় আমের বোঁটা খসে পড়া মিষ্টি সুবাস। চারদিকে তখন উৎসবের আমেজ। আম, জাম, কাঁঠাল আর লিচুর রসে টইটম্বুর এই চেনা প্রকৃতি। গ্রামীণ জনপদে এই সময়টাকে আমরা বলি ‘মধু মাস’। আর এই মধু মাসের অলিখিত এক অতিথি হলো আমাদের অতি পরিচিত, চিরচেনা ‘কুটুম পাখি’— যাকে আমরা অনেকেই হলদে পাখি বা ‘বউ কথা ক’ নামে ডেকে থাকি।

​মধু মাসের সঙ্গে এই কুটুম পাখির সম্পর্কটা যেন যুগ-যুগান্তরের। যখনই গাছের ডালে ডালে পাকা ফলের সমারোহ ঘটে, ঠিক তখনই পাতার আড়াল থেকে ডেকে ওঠে সেই চেনা সুর। তার সেই সুমিষ্ট শিস যেন গ্রামীণ গৃহস্থকে মনে করিয়ে দেয়— ঘরে নতুন অতিথি আসার সময় হয়েছে। আমাদের দেশের কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী মুজিব পরদেশীর সেই চেনা গানের সুরও যেন এই আবহকেই মনে করিয়ে দেয়— ‘কদম ডালে কুটুম পাখি ডাকে নাম ধরে, আমার ব্যথা অন্তরে প্রাণের বন্ধু নাই ঘরে…।’ আবহমান বাংলার সংস্কৃতিতে এমন একটা লোকবিশ্বাস জড়িয়ে আছে যে, বাড়ির আঙিনায় এসে হলদে পাখি ডাকলেই নাকি কোনো প্রিয়জন বা কুটুমের আগমন ঘটবে। আর এই মধু মাসে তো চারদিকে কুটুম্বিতার ধুম পড়ে যায়। নতুন জামাইকে ঘরে তোলা, আম-কাঁঠালের তত্ত্ব পাঠানো আর স্বজনদের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি বাড়ি।

​তবে এই উৎসবের আমেজের আড়ালে গ্রামীণ জীবনে, বিশেষ করে আমাদের হাওরাঞ্চলে এখন এক ভিন্ন বাস্তবতা বিরাজ করছে। মাঠের কৃষিকাজ এখন শেষ। এবার অসময়ের অতিবৃষ্টিতে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষকের মনে আনন্দের চেয়ে বুকভরা এক নীরব হাহাকার। ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা শেষে গ্রামীণ জনপদে এখন দীর্ঘ অবসরের দিন। এই অলস সময়ে একদিকে যেমন আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া ও বিয়ের উপযুক্ত ছেলে-মেয়েদের পাত্র-পাত্রী খোঁজার ধুম পড়ে; ঠিক অন্যদিকে দেখা দেয় বেঁচে থাকার ভিন্ন এক লড়াই।

​ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকেই এখন হন্যে হয়ে ছুটছেন শহরের দিকে, একটু কাজের আশায়। কেউবা জাল কাঁধে নেমে পড়েছেন হাওর-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টায়, কেউ ব্যস্ত হাঁস-মুরগি পালনে। কিন্তু এক বিশাল জনগোষ্ঠী এই সময়ে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ে আছেন। কর্মহীন এই দিনগুলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও স্থবির করে তোলে।

​প্রযুক্তির এই তীব্র গতি আর নগরায়ণের ভিড়ে সেই চিরচেনা রূপগুলো যখন ফিকে হয়ে আসছে, তখন এই বেকার জনশক্তিকে নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এই অলস বসে থাকা কর্মক্ষম মানুষগুলোকে যদি সঠিক প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়, তবে আমাদের এলাকার চিত্র পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব। কুটির শিল্প, মৎস্য চাষের আধুনিকায়ন কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে এই দীর্ঘ অবসর আর অভিশাপ থাকবে না; এমনকি এলাকার সার্বিক উন্নয়নে এক বিরাট শক্তি হয়ে উঠবে।

​তবুও, বুকভরা আশা নিয়ে গ্রামীণ প্রকৃতি আজও সেজে ওঠে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো এক আমবাগানে বসে আজও যদি মন দিয়ে শোনা যায়, তবে পাতার খাঁজে হলদে ডানার ঝিলিক দিয়ে ডেকে উঠবে সেই পাখিটি। সে যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— যতই ঝড়-ঝাপটা আসুক, যতই আধুনিকতা আসুক না কেন, আমাদের শিকড়, আমাদের উৎসব আর আমাদের এই প্রাণের বাংলার রূপ কখনো মলিন হওয়ার নয়।

​এই মধু মাসে, কুটুম পাখির ডাক আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার আর সৌহার্দ্যের পাশাপাশি, আমাদের এই বিপুল মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অবহেলিত জনপদকে এগিয়ে নেওয়ার এক নতুন চেতনার বার্তা দিয়ে যাক।