• ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

হাওরপাড়ের নির্জনতায় মহাবিশ্বের ‘সিংগুলারিটি’: এক কলমযোদ্ধার আত্মজিজ্ঞাসা ​কলমে : হাবিবুর রহমান হাবিব

Dainik Shallar Khabor.com
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
হাওরপাড়ের নির্জনতায় মহাবিশ্বের ‘সিংগুলারিটি’: এক কলমযোদ্ধার আত্মজিজ্ঞাসা ​কলমে : হাবিবুর রহমান হাবিব

সুনামগঞ্জের শাল্লার হাওরপাড়ে যখন বর্ষার দিগন্তজোড়া জলরাশি আকাশের নীলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়, তখন কলম থমকে দাঁড়ায়। কোলাহল ছেড়ে মন চলে যায় এক অজানার দেশে। দীর্ঘ ২৬-২৭ বছর ধরে সাংবাদিকতার কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটছি, মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুঁজেছি। কিন্তু আজ জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসে নিজের ভেতর থেকে এক অতি নম্র সুর ভেসে আসছে— ‘আমি কে? সামান্য এক মাটির মানুষ হয়ে কেন এই ধরাধামে আসা, আর কোথায়ই বা সেই অনন্ত গন্তব্য?’

​১. বিজ্ঞানের সিংগুলারিটি ও আল-কুরআনের মহাবিভাজন
​আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান আজ বলছে, এই বিশাল মহাবিশ্ব এক সময় একটি অতি ক্ষুদ্র ও ঘন বিন্দুতে সীমাবদ্ধ ছিল, যাকে তারা নাম দিয়েছে ‘সিংগুলারিটি’। অথচ দেড় হাজার বছর আগে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এক পরম সত্যের দিকে ইশারা করেছেন—আকাশ ও পৃথিবী এক সময় ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল (রাতকু), অতঃপর তিনি তাদের পৃথক (ফাতাক) করেছেন। বিজ্ঞানের এই প্রসারণ আর কুরআনের এই ঐশী বাণী যেন একই সত্যের দুটি ভিন্ন ভাষা। আমরা যে আজ আলাদা হয়ে পৃথিবীতে আসলাম, তা তো সেই আদি ‘এক’ থেকেই আসা।

​২. মরমী সাধকদের দর্শন ও ‘অচিন পাখি’র সন্ধানে
​আমাদের এই পলিমাটির মহান সাধক ক্বারী আমির উদ্দিন গেয়েছেন—

​”কেউ দেখে না তারে নয়নে, ডাকি আমি কাতরে… জিকির পড়রে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু।” তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, সেই পরম সত্তাকে চর্মচক্ষে দেখা না গেলেও অন্তরের গভীর থেকে ডাকলে তাঁকে অনুভব করা যায়। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম যখন বলেন, “মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে”, কিংবা হাসন রাজা যখন পরম বিনয়ে বলেন, “আমি কিছু নই রে আমি কিছু নই”, তখন মনে হয় জীবনের এই নাম-ডাক, পদ-পদবি সবই নশ্বর। হাসন রাজার সেই ‘অহং’ ত্যাগের বাণীই আজ আমার পাথেয়। নিজেকে বড় ভাবার মোহের চেয়ে ‘কিছু না’ হওয়ার মাঝেই যে প্রকৃত আনন্দ, তা এই মরমী সুরগুলো ছাড়া বোঝা দায়।

​৩. খবরের অন্তরালে এক শাশ্বত তৃষ্ণা
​দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে সমাজ আর মানুষের নানা কথা, আনন্দ-বেদনা আর অধিকারের লড়াই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লিখেছি। কিন্তু যখন কায়কোবাদের ‘আজান’ কিংবা পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের ‘কবর’ কবিতা পড়ি, তখন বুঝতে পারি—সব খবরের উপরে এক মহাসাংবাদ আছে। আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতার প্রয়াণ আমাকে এক কঠোর ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই পৃথিবীটা আমাদের স্থায়ী নীড় নয়; এটি কেবল একটি ক্ষুদ্র ‘রেলস্টেশন’ মাত্র। আমাদের গন্তব্য সেই অনন্ত জীবনে, যেখানে সময়ের কোনো দেয়াল নেই।

​৪. উপসংহার: ধূলিকণা থেকে ধূলিকণায় ফেরা
​নদী যেমন সাগরে মেশে, আবার মেঘ হয়ে সেই মূলে বা পাহাড়েই ফিরে আসে; মহাবিশ্বও তেমনি এক বিন্দু থেকে শুরু হয়ে আবার এক বিন্দুতেই বিলীন হবে। মানুষের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। আমার এই সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় এখন আমি কেবল বাইরের জগতের খবর নয়, বরং ভেতরের সেই ‘আমি’র খবর নিচ্ছি। অহংকার নয়, বরং একবিন্দু জল হয়ে সেই দয়াময় স্রষ্টার রহমতের সাগরে মিশে যাওয়াই হোক আমার জীবনের মূল লক্ষ্য।