সৃষ্টির রহস্য ও মানুষের মর্যাদা: একটি মহাজাগতিক সংলাপ

Dainik Shallar Khabor.com
প্রকাশিত June 27, 2026
সৃষ্টির রহস্য ও মানুষের মর্যাদা: একটি মহাজাগতিক সংলাপ

হাবিবুর রহমান হাবিব, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা-সুনামগঞ্জ।
​মহাবিশ্বের বিশালতায় মানুষের অবস্থান কোথায়? কেন আল্লাহ তাআলা এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষকে তাঁর ‘প্রতিনিধি’ বা খলিফা হিসেবে মনোনীত করলেন? পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ৩০ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতগুলো যেন সেই মহাজাগতিক প্রশ্নের এক চিরন্তন উত্তর ও জীবনদর্শন।
​সৃষ্টির প্রাকলগ্নে যখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জানালেন, “আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি”, তখন ফেরেশতাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল এক যৌক্তিক সংশয়। তারা আশঙ্কা করেছিল, মানুষ পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা আর রক্তপাতে লিপ্ত হবে। কিন্তু আল্লাহ তাদের যে উত্তর দিলেন—”আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না”—তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সৃষ্টির পেছনে এমন এক গভীর প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে যা কেবল অসীম স্রষ্টাই জানেন।
​আল্লাহ তাআলা হজরত আদমকে (আ.) ‘নাম’ বা জগতের সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান দান করলেন। এরপর তিনি ফেরেশতাদের সেই নামগুলো জিজ্ঞাসা করলেন। ফেরেশতারা বিনম্র চিত্তে স্বীকার করলেন, স্রষ্টার দেওয়া জ্ঞান ছাড়া তাদের নিজস্ব কোনো জ্ঞান নেই। এই আয়াতের শিক্ষাটি অত্যন্ত স্পষ্ট—মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি তার শারীরিক শক্তি বা বংশ পরিচয় নয়; বরং মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জ্ঞান, বোধশক্তি এবং অর্জিত প্রজ্ঞায়। এই জ্ঞানই মানুষকে সৃষ্টির সেরার মর্যাদা এনে দিয়েছে।
​জ্ঞানের পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর যখন আদমকে (আ.) সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হলো, তখন সবাই সেজদা করলেও ইবলিস তার অহংকারে অটল রইল। তার যুক্তি ছিল সে আগুনের তৈরি, আর মানুষ মাটির। এই ছোট্ট একটি ‘অহংকার’ ইবলিসের সমস্ত ইবাদতকে ধূলিসাৎ করে দিল। এটি আমাদের আধুনিক জীবনের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা—অহংকার এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রান্ত ধারণা মানুষকে কত দ্রুত সত্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে, ইবলিসের পরিণতি তারই প্রমাণ।
​পরিশেষে বলা যায়, সূরা বাকারার এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা পৃথিবীতে নিছক কোনো সাধারণ সত্তা নই। আমরা আল্লাহর প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব বড়ই কঠিন—সত্যের জ্ঞান অর্জন, ন্যায়ের পথে চলা এবং অহংকারমুক্ত বিনম্র একটি জীবন গড়ে তোলা। আজকের অস্থির পৃথিবীতে, যেখানে মানুষে-মানুষে বিবাদ ও অহংকার চরম আকার ধারণ করেছে, সেখানে এই মহাজাগতিক শিক্ষাগুলোই হতে পারে আমাদের সঠিক পথের দিশারি।